নামাবলি গায়ে মন্দিরে যাই, পাথরেতে মাথা ঠেকাই
তবু কোনদিনই যে তাঁর দেখা না পাই
আমি পথ হাঁটি মিছিলেতে, আমি প্রতিবাদী মর্মেতে
তত্ত্বের টক-ঝাল-মিষ্টি বুলি কপচাই
আমি জেনেছি এ জীবন মহান, তাই মনে রাখি কবির প্রয়াণ
শুধু ভুলে যাই ধূসর কোষের অস্তিত্ত্বটাই
Wednesday, August 10, 2011
Thursday, March 10, 2011
আমাকে আমার মতন থাকতে দাও
পাঞ্চলাইন হরণের স্বর্ণযুগে এই লাইনটা ধার না করে থাকতে পারলাম না। নিজের ইচ্ছেতে যতবার শুনেছি, তার চেয়ে ঢের বেশিবার অন্যের ঠেলায় শুনতে হয়েছে - সৌজন্যে কলার টিউন। কিন্তু এই লাইনটা রচনার প্রশংসা না করে পারছি না। এত নম্র ভদ্র আর্তির মোড়কে বেশ কড়া একটা মুখঝামটা লুকিয়ে আছে - 'নিজের চরকায় তেল দাও'।
রোজকার জীবনে এই লাইনটার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। অফিসের কোনো বড় কর্তা যখনই দলগত সংহতি জাতীয় বক্তব্য রাখেন, কেন জানি না মনের ব্যাকগ্রাউন্ডে এই লাইনটা গমগমিয়ে বাজতে থাকে। নববর্ষ বা বিজয়ার পরে কিছু অপ্রয়োজনীয় আত্মীয়ের সাথে খেজুরে আলাপচারিতাতেও এই লাইনটা বেশ জ্বলজ্বলে। যখন অফিসফেরৎ ট্রেনে জানলার ধারের আলতো তন্দ্রাটা কোনো হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া বকবকে পরিচিতর অত্যাচারে বিপন্ন হত, এই লাইনটাই যেন অসহায় ভাবে হাতড়ে বেড়াতাম। সেই সময় না থাকুক, আজ তো আছে। সেই সমস্ত মানুষ যারা তাদের না-চাওয়া মতামতের ঝুড়ি নিয়ে সময়ে-অসময়ে বিব্রত করে বেরায়, তাদের মতুয়া নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে আমার আজকের হাতিয়ার - 'আমাকে আমার মতন থাকতে দাও'।
নিজেদের অলস সময়কে অন্যের জীবনের বিরক্তিতে রূপান্তরিত করা কিছু মানুষের জন্মগত প্রতিভা। এই প্রতিভারা পাটিল হলে হয়ত রাষ্ট্রপতি হতে পারত, কিন্তু বাতিল হওয়ায় এরা আজ মূর্তিমান ত্রাস। বিশেষত আমার মতন 'হ্যাপিলি সিঙ্গল' শ্রেণীর গোবেচারাদের জীবন আজ এদের দয়ায় বিপন্ন। অবিবাহিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের বিন্দুমাত্র ত্রুটি আবিষ্কার করতে না পারলেও, তাদের অস্তিত্ত্বে এদের ঘোর অস্বস্তি। ভাগ্যদেবীর বিরূপতায় এদের সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে বাঘের গলায় মালা পড়ানো বোধহয় অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ। ঈশ্বরের দয়ায় আজ এদের ভাইরাল আক্রমণের বিরুদ্ধে আমার প্রতিষেধক - 'আমাকে আমার মতন থাকতে দাও', সঙ্গে মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে ছোট্ট নোট, 'কখনও কি দেখেছ নিজেদের দিকে তাকিয়ে?'
রোজকার জীবনে এই লাইনটার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। অফিসের কোনো বড় কর্তা যখনই দলগত সংহতি জাতীয় বক্তব্য রাখেন, কেন জানি না মনের ব্যাকগ্রাউন্ডে এই লাইনটা গমগমিয়ে বাজতে থাকে। নববর্ষ বা বিজয়ার পরে কিছু অপ্রয়োজনীয় আত্মীয়ের সাথে খেজুরে আলাপচারিতাতেও এই লাইনটা বেশ জ্বলজ্বলে। যখন অফিসফেরৎ ট্রেনে জানলার ধারের আলতো তন্দ্রাটা কোনো হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া বকবকে পরিচিতর অত্যাচারে বিপন্ন হত, এই লাইনটাই যেন অসহায় ভাবে হাতড়ে বেড়াতাম। সেই সময় না থাকুক, আজ তো আছে। সেই সমস্ত মানুষ যারা তাদের না-চাওয়া মতামতের ঝুড়ি নিয়ে সময়ে-অসময়ে বিব্রত করে বেরায়, তাদের মতুয়া নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে আমার আজকের হাতিয়ার - 'আমাকে আমার মতন থাকতে দাও'।
নিজেদের অলস সময়কে অন্যের জীবনের বিরক্তিতে রূপান্তরিত করা কিছু মানুষের জন্মগত প্রতিভা। এই প্রতিভারা পাটিল হলে হয়ত রাষ্ট্রপতি হতে পারত, কিন্তু বাতিল হওয়ায় এরা আজ মূর্তিমান ত্রাস। বিশেষত আমার মতন 'হ্যাপিলি সিঙ্গল' শ্রেণীর গোবেচারাদের জীবন আজ এদের দয়ায় বিপন্ন। অবিবাহিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের বিন্দুমাত্র ত্রুটি আবিষ্কার করতে না পারলেও, তাদের অস্তিত্ত্বে এদের ঘোর অস্বস্তি। ভাগ্যদেবীর বিরূপতায় এদের সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে বাঘের গলায় মালা পড়ানো বোধহয় অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ। ঈশ্বরের দয়ায় আজ এদের ভাইরাল আক্রমণের বিরুদ্ধে আমার প্রতিষেধক - 'আমাকে আমার মতন থাকতে দাও', সঙ্গে মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে ছোট্ট নোট, 'কখনও কি দেখেছ নিজেদের দিকে তাকিয়ে?'
Labels:
Amake amar moto thakte dao,
Anirban,
Bengali,
Humour,
Sarcasm
Tuesday, December 21, 2010
থ্যাংক্স্ অ্যাণ্ড রিগার্ড্স্
ডিয়ার স্যার,
আশাকরি এই ইমেল আপনাকে আপনার স্বাস্থের শিখরে পাবে।
ঘাবড়াবেন না। আপনি কোনো লটারী জেতেননি, বা নাইজেরিয়ার কোনো বিধবা আপনার মারফৎ তার প্রয়াত স্বামীর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ট্রান্সফার করতে ইচ্ছুক নন। না না, বিট্টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করার জন্য আইনি নোটিসও নয়।
এটি একটি বড়ই সাধারণ সৌজন্যমূলক ইমেল। জানি এবার কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন আজ থেকে ১৫ বছর আগে ১৫ পয়সার একটি পোস্টকার্ডে এমনই এক চিঠি পেলে কি খুশিই না হতেন। আরে আরে করছেন কি? ডিলিট বাট্ন থাকলেই কি সব বিরক্তি দূর হয় নাকি? শুক্রবার সন্ধ্যে ৭টায় মিটিং পড়লে পারেন ব্যবহার করতে এই বাট্ন? পড়ুনই না নাহয় এই কটা লাইন।
জানি আপনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই দেখে নিয়েছেন এই ইমেলের প্রেরক কোনো ফিমেল নয়। এটাও জানেন যে বাংলায় কর্মসংযোগমূলক ইমেলের সম্ভাবনা নিতান্তই অমূলক। নিমন্ত্রণী ইমেল হলে আয়োজক সাধারণত আগেই দিয়ে রাখে তার পূর্বাভাস। অতএব আপনার সিদ্ধান্ত বৃক্ষ (ডিসিশন ট্রি) অনুযায়ী এটি অবশ্যই একটি জাঙ্ক মেল।
কিন্তু এটা নিশ্চয়ই আপনাকে ভাবাচ্ছে যে আপনার ঠিকানা পেলাম কোথা থেকে। কোথায় কোথায় নিজের ইমেল আইডি রেজিস্টার করেছেন তা নিজেকেই ভাবতে হচ্ছে। মগজ অন্বেষণে গুগ্লের সাহায্য এখনও পাওয়া যায়নি। না না বেশি ভাববেন না। আমিই বলে দিচ্ছি। আপনার অতি মূল্যবান মস্তিষ্কের এই অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ঘোর অপরাধ। এই ভাবনার ঠেলায় আমি চাই না যে প্রতিদিন অফিসে গিয়ে সবার আগে আপনি যে স্টক কোট্ গুলো দেখেন, তার একটিও বাদ যাক। বা যদি কোনো সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে কারো সদ্য আপলোড করা ছবিতে কমেন্ট দিতে ভুলে যান, সে মহান দায় তো আমার ঘাড়েই চাপবে।
আমি জানি আপনি প্রচন্ড ডাইরেক্ট। এত গৌরচন্দ্রিকা সহ্য করতে পারেন না। তাহলে শুনুন। আমার পকেটে হঠাৎই একটি বিজ্নেস কার্ডে আপনার যোগাযোগগুলি পেলাম। আমি জানি আপনি আপনার বিজ্নেস কার্ড ব্যবহারে অতি যত্নবান। একটি কার্ডও প্রচন্ড প্রয়োজন ছাড়া খরচা করেন না। ব্যতিক্রমে মাঝে মাঝে কোনো রেস্টুরেন্টে খরচ করেন, কিন্তু তাওতো ঐ একটা মহামূল্যবান ফ্রি লাঞ্চের আশায়। তাছাড়া যেটুকু ব্যবহার করেন, তাতে আমার কাছে যে কার্ডটি আছে তার মতই অতি যত্নে নিজের ব্যাক্তিগত ইমেল আইডিটিও লিখে দেন।
এবার তাহলে আপনি ভাবছেন আমি কে? না না এবারেও ভাববেন না। কেননা ইতিমধ্যে অনেক ভেবেও আপনার মত মহামানবকে স্মরণ করতে পারিনি। আপনিও পারবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এই ইমেলটিকে আপনার বিজ্নেস কার্ডের প্রাপ্তিস্বীকার হিসাবে গণ্য করতে পারেন।
অতি ধৈর্য ধরে আপনার এই ইমেল পাঠের জন্য রইল শেষ দুই শব্দ ...
থ্যাংক্স্ অ্যাণ্ড রিগার্ড্স্
আশাকরি এই ইমেল আপনাকে আপনার স্বাস্থের শিখরে পাবে।
ঘাবড়াবেন না। আপনি কোনো লটারী জেতেননি, বা নাইজেরিয়ার কোনো বিধবা আপনার মারফৎ তার প্রয়াত স্বামীর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ট্রান্সফার করতে ইচ্ছুক নন। না না, বিট্টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করার জন্য আইনি নোটিসও নয়।
এটি একটি বড়ই সাধারণ সৌজন্যমূলক ইমেল। জানি এবার কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন আজ থেকে ১৫ বছর আগে ১৫ পয়সার একটি পোস্টকার্ডে এমনই এক চিঠি পেলে কি খুশিই না হতেন। আরে আরে করছেন কি? ডিলিট বাট্ন থাকলেই কি সব বিরক্তি দূর হয় নাকি? শুক্রবার সন্ধ্যে ৭টায় মিটিং পড়লে পারেন ব্যবহার করতে এই বাট্ন? পড়ুনই না নাহয় এই কটা লাইন।
জানি আপনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই দেখে নিয়েছেন এই ইমেলের প্রেরক কোনো ফিমেল নয়। এটাও জানেন যে বাংলায় কর্মসংযোগমূলক ইমেলের সম্ভাবনা নিতান্তই অমূলক। নিমন্ত্রণী ইমেল হলে আয়োজক সাধারণত আগেই দিয়ে রাখে তার পূর্বাভাস। অতএব আপনার সিদ্ধান্ত বৃক্ষ (ডিসিশন ট্রি) অনুযায়ী এটি অবশ্যই একটি জাঙ্ক মেল।
কিন্তু এটা নিশ্চয়ই আপনাকে ভাবাচ্ছে যে আপনার ঠিকানা পেলাম কোথা থেকে। কোথায় কোথায় নিজের ইমেল আইডি রেজিস্টার করেছেন তা নিজেকেই ভাবতে হচ্ছে। মগজ অন্বেষণে গুগ্লের সাহায্য এখনও পাওয়া যায়নি। না না বেশি ভাববেন না। আমিই বলে দিচ্ছি। আপনার অতি মূল্যবান মস্তিষ্কের এই অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ঘোর অপরাধ। এই ভাবনার ঠেলায় আমি চাই না যে প্রতিদিন অফিসে গিয়ে সবার আগে আপনি যে স্টক কোট্ গুলো দেখেন, তার একটিও বাদ যাক। বা যদি কোনো সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে কারো সদ্য আপলোড করা ছবিতে কমেন্ট দিতে ভুলে যান, সে মহান দায় তো আমার ঘাড়েই চাপবে।
আমি জানি আপনি প্রচন্ড ডাইরেক্ট। এত গৌরচন্দ্রিকা সহ্য করতে পারেন না। তাহলে শুনুন। আমার পকেটে হঠাৎই একটি বিজ্নেস কার্ডে আপনার যোগাযোগগুলি পেলাম। আমি জানি আপনি আপনার বিজ্নেস কার্ড ব্যবহারে অতি যত্নবান। একটি কার্ডও প্রচন্ড প্রয়োজন ছাড়া খরচা করেন না। ব্যতিক্রমে মাঝে মাঝে কোনো রেস্টুরেন্টে খরচ করেন, কিন্তু তাওতো ঐ একটা মহামূল্যবান ফ্রি লাঞ্চের আশায়। তাছাড়া যেটুকু ব্যবহার করেন, তাতে আমার কাছে যে কার্ডটি আছে তার মতই অতি যত্নে নিজের ব্যাক্তিগত ইমেল আইডিটিও লিখে দেন।
এবার তাহলে আপনি ভাবছেন আমি কে? না না এবারেও ভাববেন না। কেননা ইতিমধ্যে অনেক ভেবেও আপনার মত মহামানবকে স্মরণ করতে পারিনি। আপনিও পারবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এই ইমেলটিকে আপনার বিজ্নেস কার্ডের প্রাপ্তিস্বীকার হিসাবে গণ্য করতে পারেন।
অতি ধৈর্য ধরে আপনার এই ইমেল পাঠের জন্য রইল শেষ দুই শব্দ ...
থ্যাংক্স্ অ্যাণ্ড রিগার্ড্স্
Saturday, December 5, 2009
নায়কের সাথে
বাড়ি ফেরার মিষ্টি অনুভূতির মাঝে বেশ বিস্বাদ তিরিশ ঘন্টার এই জার্নি। যদিও আশেপাশের নিদ্রাবিহীন ঈর্ষাকাতর সহযাত্রীদের বিরক্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অধিকাংশ সময়টাই ঘুমিয়েছি, তবুও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষুদ্র ত্রুটিটুকুর সমালোচনা করার অধিকার ছাড়তে আমি বিন্দুমাত্র রাজি নই। ঘুমের আমেজটা না কাটলেও, প্লেন ল্যাণ্ড করা মাত্র নেমে পড়ার এক অতিব্যস্ততা কোথা থেকে যেন চেপে বসে। হয়ত সেটা "ক্যাট্ল ক্লাস" - এর আন্তর্জাতিক যাত্রীগরিমারই এক অঙ্গ। পেছনের সারির যাত্রি যদি আমার আগে অবতরণ করে, আমার পোর্টফোলিওতে কতটা লোকসান হবে তা না জানলেও, তাকে আগে নামতে দেওয়ার ঝুঁকিটা নিতে সাহস হয় না।
আগামী নয় ঘন্টা ট্রান্সিট প্যাসেঞ্জারের ভূমিকায় যে অভিজ্ঞতা হয় তার সাথে নিজের বিষ্ঠা হাতে প্যাথলজিকাল ক্লিনিকে লাইন দেওয়ার অনুভূতির বেশ মিল আছে। বিরক্তিকর, অথচ আবশ্যিক। এয়ারপোর্টের বাকি স্বদেশীয়দের মত আগে আমিও নিজের ক্যামেরাস্ত্র শাণিয়ে দাপিয়ে বেড়াতাম। সুন্দর মূর্তি থেকে ভর্তি ডাস্টবিন - সবই তখন ছিল বেশ আকর্ষক। দানবীয় চেহারার শ্বেতাঙ্গদের ক্যামেরা ধরিয়ে দিয়ে নিজের বিভিন্ন ছবি তোলানোয় যে আনন্দ পেতাম, তা লর্ডসের বারান্দায় আঁদুল গায়ে গেঞ্জি ওড়ানোর থেকে কম ছিল না।
লাউঞ্জে উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাচলার মাঝেই চোখে পড়ল একটা স্টারবাক্স্। লম্বা ফ্লাইটের বিনামূল্য আহারাদির একঘেয়েমি কাটাতেই লাইন দিলাম তার সামনে। সামনের বিশালায়তন লোকটাকে কেন জানি না বেশ চেনা চেনা লাগছিল। কিছুটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করার মতন অন্য দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম "হ্যালো"। লোকটি পিছন ঘুরতেই আমি স্তম্ভিত। সামনে দাঁড়িয়ে সঞ্জয় দত্ত - বোলে তো মুন্নাভাই। মগজের প্রসেসিং ইউনিটগুলো চালু হওয়ার আগেই জেগে উঠল পুরনো অভ্যেস। বিদ্যুৎবেগে ব্যাগ থেকে বের করে আনলাম ক্যামেরা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধাবৃদ্ধকে রীতিমত আদেশ করলাম আমার ছবি তুলে তার জীবন ধন্য করার জন্য। 'দিমাগ্ কি বাত্তি' তখন জ্বলে গেছে। সেই আলোয় ছকে ফেলছি অরকুট্, ফেসবুক, পিকাসার ভবিষ্যৎ অ্যালবামগুলো। ভদ্রলোক বিনা বিরক্তিতেই ছবি তুললেন। তার পারদর্শিতায় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে যাচাই করে নিলাম ছবিগুলো। ইতিমধ্যে প্রবাসীগরিমাও প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। বলে বসলাম সঞ্জুবাবাকে - "তুমি চাইলে ছবিগুলো তোমাকে ইমেল করে দিতে পারি"। এই মাত্রার অর্বাচীনতায় অপ্রস্তুত হয়ে উনি বাধ্য হলেন একটি বিজনেস কার্ড খরচ করতে।
কফি নিয়ে দুজনেই বসলাম একটা টেবিলে। আমার কিছু অর্থহীন প্রশ্ন ও ওনার কিছু অর্থহীন দর্শন পারস্পরিকভাবে হজম করতে হচ্ছিল। কথায় কথায় জানতে পারলাম যে কোনো এক শুটিং এর দৌলতে শহরটা ভদ্রলোকের চেনা। ট্রান্সিট ভিসা নিয়ে শহর দেখতে বেরনোর উত্তেজনাটা আমার আবার একটু কম। তবু সঞ্জুবাবা জিজ্ঞেস করলেন - "বেরোবে নাকি শহরটা ঘুরতে?"
কিছুটা ভেবে বললাম - "ভিসা নিয়ে সমস্যা হবে না তো?"
- "তোমার আশা করি আমেরিকান ভিসা আছে। অসুবিধা হবে কেন?"
- সমস্যাটা আমায় নিয়ে নয়। আসলে আপনার টাডাজনিত ব্যাপারগুলো যদি এরা জানে ... "
সঞ্জুবাবা ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে জানালেন সেটা কোনো সমস্যাই না। অতএব অভিবাসনের বেড়া টপকে বেড়িয়ে পড়লাম সিটি ট্যুরে।
ঔদ্ধত্যের পারদ চড়চড়িয়ে বাড়তে লাগল। আমার ভ্রমণসঙ্গী হওয়ার অপরাধে সঞ্জুবাবা এখন ফটোগ্রাফার। ল্যাণ্ডস্কেপ, পোর্ট্রেট এবং প্যানোরামিক ফটোগ্রাফির উপর জ্ঞানও দিতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর খিদেতা টের পেলাম। সামনেই ছিল একটা ভারতীয় রেস্তোঁরা। বাড়ির কাছাকাছি এসে অন্য কিছু খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। ঢুকে পড়লাম তাতেই।
রেস্তোঁরাটি পাঞ্জাবী। দেওয়ালে গুরু গোবিন্দ সিং-এর মুচকি হাসি দৃশ্যমান। কাউন্টারে অর্ডার দিয়ে টেবিলে এসে বসতেই চমকে উঠলেন নায়ক। উল্টোদিকের টেবিলে বসা এক সর্দারকে দেখে বলিউডের ম্যাচোম্যানের তখন এক ত্রস্ত চেহারা। কপালের টাক বেঁয়ে ঘামের ফোঁটাগুলো মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বকে প্রমাণ করছে। সর্দারজি উত্তেজিত হয়ে গুরমুখী ভাষায় লম্বা-চওড়া কিছু একটা বক্তব্য রাখামাত্র অন্য টেবিল থেকে আরও কিছু সর্দার উঠে দাঁড়াল। বক্তব্যটা না বুঝলেও আমার মনে হল যে কোনো সাউন্ডট্র্যাক চালিয়ে রেকর্ড করলে, বেশ খাসা ভাংড়া হিপহপ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। পরিস্থিতি অবশ্য বেশ গম্ভীর। সঞ্জুবাবাকে বিষয় বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলাম। তাতে জানা গেল যে কোনো এক শুটিং-এর সময় সঞ্জুবাবা আর এই সর্দার একই হোটেলে ছিলেন। একদিন সুইমিং পুলের ধারে কোনো দুর্ঘটনাবশত সঞ্জুবাবার অন্তর্বাস সর্দারজির পাগড়ির ওপর স্থান পায়। ব্যাপারটা বেশ অসম্মানজনক মনে হওয়ায় সর্দারজি তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সঞ্জুবাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দুটোর ভূমিকা প্রায় একই। তাতেই এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেইবার প্রোডাকশন ইউনিটের বদান্যতায় কোনোরকমে নিস্তার পান। কিন্তু এবার মুক্তির আশা ক্ষীণ। মারমুখী সর্দারবাহিনী ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে।
সঞ্জুবাবা টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অ্যাকশন হিরোগিরি বলিউডের সেলুলয়েডেই ফিক্সড ডিপোসিট করা আছে। সেটাকে ভাঙানোর দুঃসাহস করবেন না বলেই আমার ধারণা। কোনোরকমে পিছন ফিরে তিনি যে দৌড়টা দিলেন তা অনেকটা সবে ছেড়ে দেওয়া লোকাল ট্রেনের পিছনে লেট হওয়া নিত্যযাত্রীর দৌড়ের মতন। সেই সময় দরজা আগলে দাঁড়ালেন প্রৌড় হোটেল মালিক। একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতি। আমেরিকান ফুটবলের এটা খুব পরিচিত দৃশ্য। নায়ক কি পারবে বুড়োকে ডজ করে বেরোতে। এ এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে চলছে ব্রেকিং নিউজ, অথচ নিচে নেই শেয়ারমূল্যের টিকার। একটা চেয়ার তুলে নিয়ে চিৎকার করে বৃদ্ধ ছুটে এলেন সঞ্জুবাবার দিকে।
একটা বিকট শব্দে নড়েচড়ে বসলাম। আমার রুমমেট দরজায় জানান দিল যে সময়টা দুপুর দুটো। শুক্রবার রাতের ঘুমে কি যে মাদকতা আছে তা আজও বুঝিনা। ঘুম থেকে জেগে স্বপ্নের যে রেসিডুয়াল অংশটা পড়ে থাকে, তার থেকেই নিংড়ে বার করলাম উপরোক্ত "ট্রান্সিট প্যাসেঞ্জারের ডায়েরি"। নিজেকে কিছুটা ঝাড়পোছ করে আনমনেই বেরিয়ে পড়লাম স্টারবাক্সের উদ্দেশে। যদি মনে পড়ে ঠিক কি হয়েছিল শেষটায় ... নায়কের সাথে।
আগামী নয় ঘন্টা ট্রান্সিট প্যাসেঞ্জারের ভূমিকায় যে অভিজ্ঞতা হয় তার সাথে নিজের বিষ্ঠা হাতে প্যাথলজিকাল ক্লিনিকে লাইন দেওয়ার অনুভূতির বেশ মিল আছে। বিরক্তিকর, অথচ আবশ্যিক। এয়ারপোর্টের বাকি স্বদেশীয়দের মত আগে আমিও নিজের ক্যামেরাস্ত্র শাণিয়ে দাপিয়ে বেড়াতাম। সুন্দর মূর্তি থেকে ভর্তি ডাস্টবিন - সবই তখন ছিল বেশ আকর্ষক। দানবীয় চেহারার শ্বেতাঙ্গদের ক্যামেরা ধরিয়ে দিয়ে নিজের বিভিন্ন ছবি তোলানোয় যে আনন্দ পেতাম, তা লর্ডসের বারান্দায় আঁদুল গায়ে গেঞ্জি ওড়ানোর থেকে কম ছিল না।
লাউঞ্জে উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাচলার মাঝেই চোখে পড়ল একটা স্টারবাক্স্। লম্বা ফ্লাইটের বিনামূল্য আহারাদির একঘেয়েমি কাটাতেই লাইন দিলাম তার সামনে। সামনের বিশালায়তন লোকটাকে কেন জানি না বেশ চেনা চেনা লাগছিল। কিছুটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করার মতন অন্য দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম "হ্যালো"। লোকটি পিছন ঘুরতেই আমি স্তম্ভিত। সামনে দাঁড়িয়ে সঞ্জয় দত্ত - বোলে তো মুন্নাভাই। মগজের প্রসেসিং ইউনিটগুলো চালু হওয়ার আগেই জেগে উঠল পুরনো অভ্যেস। বিদ্যুৎবেগে ব্যাগ থেকে বের করে আনলাম ক্যামেরা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধাবৃদ্ধকে রীতিমত আদেশ করলাম আমার ছবি তুলে তার জীবন ধন্য করার জন্য। 'দিমাগ্ কি বাত্তি' তখন জ্বলে গেছে। সেই আলোয় ছকে ফেলছি অরকুট্, ফেসবুক, পিকাসার ভবিষ্যৎ অ্যালবামগুলো। ভদ্রলোক বিনা বিরক্তিতেই ছবি তুললেন। তার পারদর্শিতায় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে যাচাই করে নিলাম ছবিগুলো। ইতিমধ্যে প্রবাসীগরিমাও প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। বলে বসলাম সঞ্জুবাবাকে - "তুমি চাইলে ছবিগুলো তোমাকে ইমেল করে দিতে পারি"। এই মাত্রার অর্বাচীনতায় অপ্রস্তুত হয়ে উনি বাধ্য হলেন একটি বিজনেস কার্ড খরচ করতে।
কফি নিয়ে দুজনেই বসলাম একটা টেবিলে। আমার কিছু অর্থহীন প্রশ্ন ও ওনার কিছু অর্থহীন দর্শন পারস্পরিকভাবে হজম করতে হচ্ছিল। কথায় কথায় জানতে পারলাম যে কোনো এক শুটিং এর দৌলতে শহরটা ভদ্রলোকের চেনা। ট্রান্সিট ভিসা নিয়ে শহর দেখতে বেরনোর উত্তেজনাটা আমার আবার একটু কম। তবু সঞ্জুবাবা জিজ্ঞেস করলেন - "বেরোবে নাকি শহরটা ঘুরতে?"
কিছুটা ভেবে বললাম - "ভিসা নিয়ে সমস্যা হবে না তো?"
- "তোমার আশা করি আমেরিকান ভিসা আছে। অসুবিধা হবে কেন?"
- সমস্যাটা আমায় নিয়ে নয়। আসলে আপনার টাডাজনিত ব্যাপারগুলো যদি এরা জানে ... "
সঞ্জুবাবা ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে জানালেন সেটা কোনো সমস্যাই না। অতএব অভিবাসনের বেড়া টপকে বেড়িয়ে পড়লাম সিটি ট্যুরে।
ঔদ্ধত্যের পারদ চড়চড়িয়ে বাড়তে লাগল। আমার ভ্রমণসঙ্গী হওয়ার অপরাধে সঞ্জুবাবা এখন ফটোগ্রাফার। ল্যাণ্ডস্কেপ, পোর্ট্রেট এবং প্যানোরামিক ফটোগ্রাফির উপর জ্ঞানও দিতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর খিদেতা টের পেলাম। সামনেই ছিল একটা ভারতীয় রেস্তোঁরা। বাড়ির কাছাকাছি এসে অন্য কিছু খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। ঢুকে পড়লাম তাতেই।
রেস্তোঁরাটি পাঞ্জাবী। দেওয়ালে গুরু গোবিন্দ সিং-এর মুচকি হাসি দৃশ্যমান। কাউন্টারে অর্ডার দিয়ে টেবিলে এসে বসতেই চমকে উঠলেন নায়ক। উল্টোদিকের টেবিলে বসা এক সর্দারকে দেখে বলিউডের ম্যাচোম্যানের তখন এক ত্রস্ত চেহারা। কপালের টাক বেঁয়ে ঘামের ফোঁটাগুলো মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বকে প্রমাণ করছে। সর্দারজি উত্তেজিত হয়ে গুরমুখী ভাষায় লম্বা-চওড়া কিছু একটা বক্তব্য রাখামাত্র অন্য টেবিল থেকে আরও কিছু সর্দার উঠে দাঁড়াল। বক্তব্যটা না বুঝলেও আমার মনে হল যে কোনো সাউন্ডট্র্যাক চালিয়ে রেকর্ড করলে, বেশ খাসা ভাংড়া হিপহপ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। পরিস্থিতি অবশ্য বেশ গম্ভীর। সঞ্জুবাবাকে বিষয় বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলাম। তাতে জানা গেল যে কোনো এক শুটিং-এর সময় সঞ্জুবাবা আর এই সর্দার একই হোটেলে ছিলেন। একদিন সুইমিং পুলের ধারে কোনো দুর্ঘটনাবশত সঞ্জুবাবার অন্তর্বাস সর্দারজির পাগড়ির ওপর স্থান পায়। ব্যাপারটা বেশ অসম্মানজনক মনে হওয়ায় সর্দারজি তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সঞ্জুবাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দুটোর ভূমিকা প্রায় একই। তাতেই এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেইবার প্রোডাকশন ইউনিটের বদান্যতায় কোনোরকমে নিস্তার পান। কিন্তু এবার মুক্তির আশা ক্ষীণ। মারমুখী সর্দারবাহিনী ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে।
সঞ্জুবাবা টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অ্যাকশন হিরোগিরি বলিউডের সেলুলয়েডেই ফিক্সড ডিপোসিট করা আছে। সেটাকে ভাঙানোর দুঃসাহস করবেন না বলেই আমার ধারণা। কোনোরকমে পিছন ফিরে তিনি যে দৌড়টা দিলেন তা অনেকটা সবে ছেড়ে দেওয়া লোকাল ট্রেনের পিছনে লেট হওয়া নিত্যযাত্রীর দৌড়ের মতন। সেই সময় দরজা আগলে দাঁড়ালেন প্রৌড় হোটেল মালিক। একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতি। আমেরিকান ফুটবলের এটা খুব পরিচিত দৃশ্য। নায়ক কি পারবে বুড়োকে ডজ করে বেরোতে। এ এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে চলছে ব্রেকিং নিউজ, অথচ নিচে নেই শেয়ারমূল্যের টিকার। একটা চেয়ার তুলে নিয়ে চিৎকার করে বৃদ্ধ ছুটে এলেন সঞ্জুবাবার দিকে।
একটা বিকট শব্দে নড়েচড়ে বসলাম। আমার রুমমেট দরজায় জানান দিল যে সময়টা দুপুর দুটো। শুক্রবার রাতের ঘুমে কি যে মাদকতা আছে তা আজও বুঝিনা। ঘুম থেকে জেগে স্বপ্নের যে রেসিডুয়াল অংশটা পড়ে থাকে, তার থেকেই নিংড়ে বার করলাম উপরোক্ত "ট্রান্সিট প্যাসেঞ্জারের ডায়েরি"। নিজেকে কিছুটা ঝাড়পোছ করে আনমনেই বেরিয়ে পড়লাম স্টারবাক্সের উদ্দেশে। যদি মনে পড়ে ঠিক কি হয়েছিল শেষটায় ... নায়কের সাথে।
Sunday, August 16, 2009
'কামিনে'
ভারতীয় চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে এক রেঁনেসার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তার এক বলিষ্ঠ উদাহরণ বিশাল ভরদ্বাজের সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবি 'কামিনে'। আম-আদমির গালাগাল যে সিনেমার টাইটেল হয়ে দাঁড়াতে পারে, তা বোধহয় রাজ কাপুর - গুরু দত্তেরা কস্মিনকালেও ভাবেননি। তাদের দৌড় 'চোর', 'শরাবী', 'জংলী', 'জানোয়ার'-এই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাতেও হালফিলে 'চ্যালেঞ্জ নিবি না শালা' জাতীয় নাম উঠে আসছে। আগামীদিনে চার-পাঁচ অক্ষরের শব্দগুলোও যদি সিনেমার নাম হয়ে ওঠে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এতে নির্মাতার কোনো দোষ দেখা যাচ্ছে না। 'কামিয়ে নে'-র ইঁদুরদৌড়ে টিকে থাকার জন্য কামিনে জাতীয় ক্যাপ্শন অবশ্যই এক মাস্টারস্ট্রোক।
কামিনে শব্দটার ব্যুৎপত্তি নিয়ে বিশেষ আলো দেখাতে পারব না। তবে বলতে পারি শব্দটার জনপ্রিয়তার পেছনে ধর্মেন্দ্র দেওলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কুকুররূপী কামিনেদের রক্তপানের যে লিপ্সা তিনি দেখিয়েছেন, তা আজও সারমেয়কুলে রূপকথা। অন্যান্য দ্বিতীয় শ্রেণীর শব্দকে ব্রাত্য করে নির্দেশক কেন কামিনেকে বেছে নিলেন সেটা আমি বুঝিনি। লোকে বলে একতা কাপুরের সমস্ত 'ক'-পূর্বক সিরিয়াল সফল হয়ে থাকে। বিশালজি হয়ত একতামাতার তুকতাককে অবহেলা করতে পারেননি।
সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু দুই যমজ ভাই - চার্লি ও গুড্ডু। এই মন্দার বাজারে দুই ভাইকে যমজ বানিয়ে এক অভিনেতা দিয়ে চালিয়ে দেওয়া বেশ যুক্তিপূর্ণ। যমজ ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমিকায় শাহিদ কাপূর। 'আঁখো মে তেরা হি চেহ্রা'-র ক্যাবলা চকোলেট মার্কা শাহিদ আর আজকের বাইসেপ ট্রাইসেপ মোড়া শাহিদ বেশ আলাদা। অক্ষয়কুমার, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় খান্নাদের গুড়ি গুড়ি করে কাটা চুল বা আধা টাকের পাশে জন আব্রাহাম, শাহিদদের ঝাঁকড়া চুল নিশ্চয়ই কিছুটা বিরক্তি দূর করে। তাছাড়া নতুন প্রজন্মের এই তারকাদের প্রকৃত অভিনয়ের প্রতি যে অনীহা, সেটাও এক বৈচিত্র। ফেরা যাক সিনেমায়। গল্প আবর্তিত হয় দুই ভাইয়ের সম্পর্ক আর তাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে। নিঃসন্দেহে নতুন কিছু নয়। তবু গল্পের পটবিন্যাস, চরিত্র রূপায়ন, সময়োচিত কামিনেপনা ও একটা সামগ্রিক বিনোদন সিনেমাটাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
চার্লি এক রেস্কোর্সের বুকি, জীবনের লক্ষ অবশ্যই শর্টকার্টে অর্থ উপার্জন। চার্লির দর্শন অনুযায়ী জীবনে দুটিই রাস্তা - শর্টকার্ট ও ছোট শর্টকার্ট। বাস্তব জীবনে আমিও খানিকটা এরকমই উপলব্ধি করেছি ... হৃদয়হরণা মেয়েদের দুটিই পোষাক - শর্টস্কার্ট ও ছোট শর্টস্কার্ট। চার্লির বস তিন বাঙালী উন্নাসিক ভাই যারায় পেশায় মাফিয়া। মেজ ভাইয়ের চরিত্রে রজতাভ দত্তের ছোট উপস্থিতি বাঙালীদের নিশ্চয়ই আনন্দ দেবে। চার্লি এক বিশেষ উচ্চারণজনিত সমস্যায় ভোগে - সে 'শ' কে 'ফ' উচ্চারণ করে। ভাগ্যিস কোনো বাঙালী এই রোগে ভোগে না। তাহলে তার জীবনে 'শাক' আর 'শার্ট' অনুচ্চারিতই থেকে যেত।
অন্য গোবেচারা ভাই গুড্ডু এক এন্জিওতে কাজ করে। তার সমস্যা তোতলামি। এন্জিওর এক ক্যাম্পেনে পতিতালয়ে নীরোধ বিলি করার সময় সে জানতে পারে যে নিজের অসুরক্ষিত সঙ্গমে পিতৃত্ব দরজায় কড়া নাড়ছে। তার প্রেয়সী (প্রিয়াঙ্কা চোপড়া) আবার 'জয় মহারাষ্ট্র' ধ্বজাধারী ভোপে ভাউর বোন। এক কোকেন স্মাগলিং এর ঘটনায় সব চরিত্র ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। হিন্দি সিনেমায় অধুনা স্মাগলিং এর মাধ্যম হিসেবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। 'আঁখে' ছবিতে হারমোনিয়ামে টাকা লোকানো হয়েছিল। 'ঢোল'-এ তারা স্থান পেয়েছিল একটি ঢোলে। এবারে কোকেন পাচারের মাধ্যম ছিল একটি গীটার। গল্প যত ক্লাইম্যাক্সের দিকে গেছে, ততই আকর্ষক হয়েছে। মকবুল, ওঙ্কারার পর একটি ভিন্ন স্বাদের সিনেমা উপহার দেওয়ার জন্য বিশালজিকে ধন্যবাদ।
সিনেমার সুর বিশাল ভরদ্বাজেরই। মাচিস, সত্যা, ওঙ্কারা-র মত সুর না হলেও কিছু গান ভাল। হিন্দি গানের নতুন বিবর্তন নিঃসন্দেহে মোহিত চৌহান। সিল্ক রুটের 'ডুবা ডুবা'-র সাফল্য বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। প্লেব্যাকে প্রত্যাবর্তনের পর তার সমস্ত গানই মোটামুটি সুপারহিট। এই অ্যালবামে 'পেহলি বার মোহব্বত' গানটিও অসাধারণ। গুলজারের কথা সত্বেও গানের পাঞ্চলাইনে 'ঘপাক্', 'ঢন টনান' জাতীয় শব্দের ব্যবহার একটু হতাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে সিনেমাটি অবশ্যই বিনোদনে সফল। পাইরেসির বিরুদ্ধে যারা, তাদের মাথায় পড়ুক বাজ - এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও থিয়েটারে গিয়ে এই সিনেমাটি দেখায় কোনো আক্ষেপ নেই আমার। সস্তা যৌন কমেডির ভিড়ে না হেঁটে কামিনের এই প্রয়াস অবশ্যই প্রসংসনীয়।
কামিনে শব্দটার ব্যুৎপত্তি নিয়ে বিশেষ আলো দেখাতে পারব না। তবে বলতে পারি শব্দটার জনপ্রিয়তার পেছনে ধর্মেন্দ্র দেওলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কুকুররূপী কামিনেদের রক্তপানের যে লিপ্সা তিনি দেখিয়েছেন, তা আজও সারমেয়কুলে রূপকথা। অন্যান্য দ্বিতীয় শ্রেণীর শব্দকে ব্রাত্য করে নির্দেশক কেন কামিনেকে বেছে নিলেন সেটা আমি বুঝিনি। লোকে বলে একতা কাপুরের সমস্ত 'ক'-পূর্বক সিরিয়াল সফল হয়ে থাকে। বিশালজি হয়ত একতামাতার তুকতাককে অবহেলা করতে পারেননি।
সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু দুই যমজ ভাই - চার্লি ও গুড্ডু। এই মন্দার বাজারে দুই ভাইকে যমজ বানিয়ে এক অভিনেতা দিয়ে চালিয়ে দেওয়া বেশ যুক্তিপূর্ণ। যমজ ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমিকায় শাহিদ কাপূর। 'আঁখো মে তেরা হি চেহ্রা'-র ক্যাবলা চকোলেট মার্কা শাহিদ আর আজকের বাইসেপ ট্রাইসেপ মোড়া শাহিদ বেশ আলাদা। অক্ষয়কুমার, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় খান্নাদের গুড়ি গুড়ি করে কাটা চুল বা আধা টাকের পাশে জন আব্রাহাম, শাহিদদের ঝাঁকড়া চুল নিশ্চয়ই কিছুটা বিরক্তি দূর করে। তাছাড়া নতুন প্রজন্মের এই তারকাদের প্রকৃত অভিনয়ের প্রতি যে অনীহা, সেটাও এক বৈচিত্র। ফেরা যাক সিনেমায়। গল্প আবর্তিত হয় দুই ভাইয়ের সম্পর্ক আর তাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে। নিঃসন্দেহে নতুন কিছু নয়। তবু গল্পের পটবিন্যাস, চরিত্র রূপায়ন, সময়োচিত কামিনেপনা ও একটা সামগ্রিক বিনোদন সিনেমাটাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
চার্লি এক রেস্কোর্সের বুকি, জীবনের লক্ষ অবশ্যই শর্টকার্টে অর্থ উপার্জন। চার্লির দর্শন অনুযায়ী জীবনে দুটিই রাস্তা - শর্টকার্ট ও ছোট শর্টকার্ট। বাস্তব জীবনে আমিও খানিকটা এরকমই উপলব্ধি করেছি ... হৃদয়হরণা মেয়েদের দুটিই পোষাক - শর্টস্কার্ট ও ছোট শর্টস্কার্ট। চার্লির বস তিন বাঙালী উন্নাসিক ভাই যারায় পেশায় মাফিয়া। মেজ ভাইয়ের চরিত্রে রজতাভ দত্তের ছোট উপস্থিতি বাঙালীদের নিশ্চয়ই আনন্দ দেবে। চার্লি এক বিশেষ উচ্চারণজনিত সমস্যায় ভোগে - সে 'শ' কে 'ফ' উচ্চারণ করে। ভাগ্যিস কোনো বাঙালী এই রোগে ভোগে না। তাহলে তার জীবনে 'শাক' আর 'শার্ট' অনুচ্চারিতই থেকে যেত।
অন্য গোবেচারা ভাই গুড্ডু এক এন্জিওতে কাজ করে। তার সমস্যা তোতলামি। এন্জিওর এক ক্যাম্পেনে পতিতালয়ে নীরোধ বিলি করার সময় সে জানতে পারে যে নিজের অসুরক্ষিত সঙ্গমে পিতৃত্ব দরজায় কড়া নাড়ছে। তার প্রেয়সী (প্রিয়াঙ্কা চোপড়া) আবার 'জয় মহারাষ্ট্র' ধ্বজাধারী ভোপে ভাউর বোন। এক কোকেন স্মাগলিং এর ঘটনায় সব চরিত্র ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। হিন্দি সিনেমায় অধুনা স্মাগলিং এর মাধ্যম হিসেবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। 'আঁখে' ছবিতে হারমোনিয়ামে টাকা লোকানো হয়েছিল। 'ঢোল'-এ তারা স্থান পেয়েছিল একটি ঢোলে। এবারে কোকেন পাচারের মাধ্যম ছিল একটি গীটার। গল্প যত ক্লাইম্যাক্সের দিকে গেছে, ততই আকর্ষক হয়েছে। মকবুল, ওঙ্কারার পর একটি ভিন্ন স্বাদের সিনেমা উপহার দেওয়ার জন্য বিশালজিকে ধন্যবাদ।
সিনেমার সুর বিশাল ভরদ্বাজেরই। মাচিস, সত্যা, ওঙ্কারা-র মত সুর না হলেও কিছু গান ভাল। হিন্দি গানের নতুন বিবর্তন নিঃসন্দেহে মোহিত চৌহান। সিল্ক রুটের 'ডুবা ডুবা'-র সাফল্য বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। প্লেব্যাকে প্রত্যাবর্তনের পর তার সমস্ত গানই মোটামুটি সুপারহিট। এই অ্যালবামে 'পেহলি বার মোহব্বত' গানটিও অসাধারণ। গুলজারের কথা সত্বেও গানের পাঞ্চলাইনে 'ঘপাক্', 'ঢন টনান' জাতীয় শব্দের ব্যবহার একটু হতাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে সিনেমাটি অবশ্যই বিনোদনে সফল। পাইরেসির বিরুদ্ধে যারা, তাদের মাথায় পড়ুক বাজ - এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও থিয়েটারে গিয়ে এই সিনেমাটি দেখায় কোনো আক্ষেপ নেই আমার। সস্তা যৌন কমেডির ভিড়ে না হেঁটে কামিনের এই প্রয়াস অবশ্যই প্রসংসনীয়।
Sunday, August 2, 2009
NABCর ডায়েরি - গা গরম
নিশ্চিন্তেই ছিলাম ... NABC যাত্রাপালার এখনো একদিন বাকি। ফোর্সড্ শাটডাউনের সুখ ল্যাদ সহকারে উপভোগ করছিলাম। হঠাৎই জেগে উঠল প্রযুক্তির অন্যতম অভিশাপ - মোবাইল ফোন। হাজিরা দিতে হবে কনভেনশন সেন্টারে। NABCর দোরগোড়ায় কর্মকর্তাদের গলায় যে পরিমাণ উচ্ছ্বাস তা বোধহয় স্বাধীনতার প্রাক্কালে নেহেরুও অনুভব করেননি। কেউ যদি কোনো Startup খুলতে চান, তাদের জন্য আমার একটা আইডিয়া আছে। এমন একটা ওষুধ বার করুন যা মানুষকে NABC কর্মকর্তাদের কাছাকাছি এনার্জি লেভেলে নিয়ে যাবে। একটা নামও ঠিক করেছি - নায়াগ্রা (Ref-ভায়াগ্রা)।
পৌছে গেলাম গ্রাউন্ড জিরোতে। মকবুল ফিদা হুসেনকে যদি ক্লাউড কম্পিউটিং এর সেমিনার শোনাতে বসানো হত, তিনি হয়ত অনুভব করতে পারতেন আমার মনের অবস্থাটা। ঢোকার মুখেই সাজানো রেজিস্ট্রেশন কাউন্টার। কিছু নওজওয়ানকে দেখলাম উৎসাহভরে ওয়েলকাম কিট গোছাচ্ছে। তাদের মধ্যে এক চিনা মেয়েও আছে। বং টং শুনে সে হয়ত চিনের সাথে কোন আত্মিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে। মোদ্দা কথা NABCর দখলে 'চাঁদনী চক টু চায়না'।
যে দলটার সাথে কাজ করতে হবে তারা সিনেমা দেখানো, সাহিত্য সম্মেলন জাতীয় কিছু রাজকার্য করবে বলে ভেবেছে। চন্দ্রবিন্দুর ভাষায় 'অনাবাসী ঢং'। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে থিয়েটার গুলি দেখে নেওয়ার। থিয়েটার বলতে একটি চিনা ডিভিডি প্লেয়ার, একটি সস্তার প্রোজেক্টর আর একটি সাদা থান। হয়ত বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক বৈধব্যের প্রতীক।
খাওয়া দাওয়া শেষে দেখা মিলল NABCর আবিষ্কার 'হিমান'-এর সাথে। এই সামান্য ব্লগে হিমানের পরিচয় দেওয়া বাতুলতা। এই মুহূর্তে তার পরিচয় বিজনেস ফোরামের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ কর্মকর্তা। যাইহোক বিশেষ কাজে নেমে এলাম লাগোয়া হিল্টন হোটেলের লবিতে। এসে পৌছেছেন কলকাতার প্রতিভারা। কবি, গায়ক, অভিনেতাদের এই অটোগ্রাফহীন উপস্থিতি চোখ টানতে বাধ্য। এক জনপ্রিয় গায়ক-কাম-নির্দেশক রীতিমত স্পিন খেতে খেতে লিফটে উঠে পরলেন। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের কমপ্লিমেন্টারি ড্রিঙ্কসের প্রভাব হয়ত। এক বয়স্ক ভদ্রলোক এসে রেজিস্ট্রেশনের বিশয়ে সাহায্য চাইতেই হিমানের ব্যস্ততা-সূচক চড়তে লাগল। জানতে পারলাম উনি প্রখ্যাত সাংবাদিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা শহরতলীর ট্রেনে নিত্য যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যেভাবে উনি তিন কলামের চটুল গল্পের সাহায্যে সান্ধ্য প্রতিদিনের বিক্রি বাড়িয়ে তুলেছেন, তা হ্যারি পটারের লেখিকার চেয়ে কম কৃতিত্বের নয়।
সন্ধ্যা ঘনাতেই বিজনেস ফোরামের ককটেল পার্টিতে মহারথীদের ভিড় বাড়তে লাগল। হিমান মহারাজও ওয়াইনের কৃপায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে। হিল্টনের বাইরের অঘোষিত স্মোকিং জোনে হিমান উপলব্ধি করল যে কলকাতাবাসীদের সাথে ওর আলাপ করা উচিত। সামনেই ছিলেন তবলাবাজিয়ে তন্ময় বোস। অতএব তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে হিমান বলে উঠল - Hey! Let's mingle! তবলায় চাটি মেরে যার অভ্যেস, কাঁধে হিমানের চাটা খেয়ে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। আধা বাংলা ও আধা ইংরাজিতে যা বললেন তার সারাংশ হল যে উনি মোটেই Mingleবাজ নন। মনমরা হিমান তবলচির এই প্রতিবাদ হজম করার জন্য পুনরায় বারের দিকেই রওনা দিল।
পেটের ভিতর একটা অস্বস্তিতে টনক নড়ল। ঘড়ির কাঁটায় খিদে উঁকি মারছে। বুঝলাম বাংলার কমরেডদের সাথে এদের তফাত কোথায়। ব্রিগেডের সভায় অন্তত সিঙ্গারা লাড্ডুর প্যাকেট জোটে। এখানে শুধুই কিছু 'প্রবাসী' সঙ এর অ্যাক্সেন্ট। ততক্ষণে গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট। আগামী তিন দিন যে কেউ এই গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। কনভেনশন সেন্টারের রাক্ষুসে পার্কিং চার্জ মিটিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির পথে। মনের মধ্যে তখন কমপ্লেক্স সুডোকু - পালাবার এখনো কি কোনো রাস্তা আছে? কানের পাশে কোনো এক অ্যাংরি ইয়ংম্যান যেন বলে উঠল - 'NABC সে বচ্না মুশকিল হি নহী, নামুমকিন হ্যায়'।
পৌছে গেলাম গ্রাউন্ড জিরোতে। মকবুল ফিদা হুসেনকে যদি ক্লাউড কম্পিউটিং এর সেমিনার শোনাতে বসানো হত, তিনি হয়ত অনুভব করতে পারতেন আমার মনের অবস্থাটা। ঢোকার মুখেই সাজানো রেজিস্ট্রেশন কাউন্টার। কিছু নওজওয়ানকে দেখলাম উৎসাহভরে ওয়েলকাম কিট গোছাচ্ছে। তাদের মধ্যে এক চিনা মেয়েও আছে। বং টং শুনে সে হয়ত চিনের সাথে কোন আত্মিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে। মোদ্দা কথা NABCর দখলে 'চাঁদনী চক টু চায়না'।
যে দলটার সাথে কাজ করতে হবে তারা সিনেমা দেখানো, সাহিত্য সম্মেলন জাতীয় কিছু রাজকার্য করবে বলে ভেবেছে। চন্দ্রবিন্দুর ভাষায় 'অনাবাসী ঢং'। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে থিয়েটার গুলি দেখে নেওয়ার। থিয়েটার বলতে একটি চিনা ডিভিডি প্লেয়ার, একটি সস্তার প্রোজেক্টর আর একটি সাদা থান। হয়ত বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক বৈধব্যের প্রতীক।
খাওয়া দাওয়া শেষে দেখা মিলল NABCর আবিষ্কার 'হিমান'-এর সাথে। এই সামান্য ব্লগে হিমানের পরিচয় দেওয়া বাতুলতা। এই মুহূর্তে তার পরিচয় বিজনেস ফোরামের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ কর্মকর্তা। যাইহোক বিশেষ কাজে নেমে এলাম লাগোয়া হিল্টন হোটেলের লবিতে। এসে পৌছেছেন কলকাতার প্রতিভারা। কবি, গায়ক, অভিনেতাদের এই অটোগ্রাফহীন উপস্থিতি চোখ টানতে বাধ্য। এক জনপ্রিয় গায়ক-কাম-নির্দেশক রীতিমত স্পিন খেতে খেতে লিফটে উঠে পরলেন। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের কমপ্লিমেন্টারি ড্রিঙ্কসের প্রভাব হয়ত। এক বয়স্ক ভদ্রলোক এসে রেজিস্ট্রেশনের বিশয়ে সাহায্য চাইতেই হিমানের ব্যস্ততা-সূচক চড়তে লাগল। জানতে পারলাম উনি প্রখ্যাত সাংবাদিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা শহরতলীর ট্রেনে নিত্য যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যেভাবে উনি তিন কলামের চটুল গল্পের সাহায্যে সান্ধ্য প্রতিদিনের বিক্রি বাড়িয়ে তুলেছেন, তা হ্যারি পটারের লেখিকার চেয়ে কম কৃতিত্বের নয়।
সন্ধ্যা ঘনাতেই বিজনেস ফোরামের ককটেল পার্টিতে মহারথীদের ভিড় বাড়তে লাগল। হিমান মহারাজও ওয়াইনের কৃপায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে। হিল্টনের বাইরের অঘোষিত স্মোকিং জোনে হিমান উপলব্ধি করল যে কলকাতাবাসীদের সাথে ওর আলাপ করা উচিত। সামনেই ছিলেন তবলাবাজিয়ে তন্ময় বোস। অতএব তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে হিমান বলে উঠল - Hey! Let's mingle! তবলায় চাটি মেরে যার অভ্যেস, কাঁধে হিমানের চাটা খেয়ে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। আধা বাংলা ও আধা ইংরাজিতে যা বললেন তার সারাংশ হল যে উনি মোটেই Mingleবাজ নন। মনমরা হিমান তবলচির এই প্রতিবাদ হজম করার জন্য পুনরায় বারের দিকেই রওনা দিল।
পেটের ভিতর একটা অস্বস্তিতে টনক নড়ল। ঘড়ির কাঁটায় খিদে উঁকি মারছে। বুঝলাম বাংলার কমরেডদের সাথে এদের তফাত কোথায়। ব্রিগেডের সভায় অন্তত সিঙ্গারা লাড্ডুর প্যাকেট জোটে। এখানে শুধুই কিছু 'প্রবাসী' সঙ এর অ্যাক্সেন্ট। ততক্ষণে গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট। আগামী তিন দিন যে কেউ এই গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। কনভেনশন সেন্টারের রাক্ষুসে পার্কিং চার্জ মিটিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির পথে। মনের মধ্যে তখন কমপ্লেক্স সুডোকু - পালাবার এখনো কি কোনো রাস্তা আছে? কানের পাশে কোনো এক অ্যাংরি ইয়ংম্যান যেন বলে উঠল - 'NABC সে বচ্না মুশকিল হি নহী, নামুমকিন হ্যায়'।
Wednesday, July 8, 2009
NABCর ডায়েরি - ফাঁদে পা
অকর্মণ্য বাঙালী তায় Software Engineer। প্রবাসে এরকম এক অদ্ভূত জীব যখন চায়ের টেবিলে IPL, অর্থনৈতিক মন্দা ও 'যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ'-এর চার্বাক দর্শন নিয়ে সুখী থাকতে চায়, ভগবানের বৈষম্যে তার ওপর নজর পড়ে আরেকদল লক্ষ্যহীন পরাকর্মব্যস্ত কিছু বাঙালীর, এক্ষেত্রে NABCর হোতাদের। By the way, NABC হল North American Bengali Conference (বঙ্গ সম্মেলন)। নিজেই দুদিন বাদে ভুলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকায় লিখে রাখলাম। যদিও ভুলে গেলে হাহুতাশ করতে হবে বলে মনে হয়না।
এবারের দায় বহন করেছিল প্রবাসী। Bay areaর একটি প্রাচীন বাঙালী সংগঠন। আমেরিকাতে ২৫ বছরেই ইতিহাস তৈরী হয়। সেক্ষেত্রে প্রবাসীকেও হয়ত ঐতিহাসিক বলা যেতে পারে বলে আমার ধারণা। এদের কোনো কোনো মহারথী চাকরী ছেড়েও NABCর কাজে প্রাণপাত করেছেন। বাঙালীর জন্য রবীন্দ্রনাথের নাইট প্রত্যাখ্যান আর এদের চাকরী ত্যাগের তুলনামূলক বিশ্লেষণ যে কোনোদিন কোনো চায়ের টেবিলের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
একদিন জনৈক এক পরিচিতা জানালেন NABCর food trial হচ্ছে। Internetএ ভোজ ক্যাটারারের নাম দেখে রসনার হুজুগে হাজির হলাম সেই ঐতিহাসিক trialএ। খাওয়ার ঠিকাদার এক South Indian রেস্টুরেন্ট। Cookbookএ বড় বড় করে লিখে নিয়েছেন যে রান্নাতে নারকেলের বদলে পোস্ত দিলেই তা বাঙালী রান্না বলে গণ্য হবে। তাকে জানানো হয়েছে যে মাছের ঝোল বাঙালীর চাইই। অতএব একটি পাত্রে দেখা দিয়েছে cat fishএর কালিয়া। আলু পোস্ত রান্নাতে কোনো কারিগরী সমস্যা দেখা দেওয়াতে তারা রেধেছেন বিন পোস্ত। মনে প্রশ্ন জাগল - এটা তরকারী, নাকি কিছু একটা contemporary? হাঁস যেমন জল বাদ দিয়ে দুধ খায়, তেমনই যারা আগে এসেছেন তারা আলু বাদ দিয়ে কষা মাংস খেয়ে ফেলেছেন। এখন অবশ্য আত্মগ্লানিতে ভুগে বাকি আলুর দিকে না তাকিয়ে তারা মিষ্টি খাওয়াতেই ব্যস্ত।
১০ ডলার দিয়ে পেলাম একটি প্লেট। অবশিষ্ট যা ছিল তা দিয়েই মেটালাম রসনার সেই অপরিণামদর্শী হুজুগ। জানতে পারলাম ভোজ ক্যাটারার আসছে না। পেলাম হোমওয়ার্ক না করার ফল। প্রতিবারের ন্যায় এবারেও যারা ভিসা পায়নি তাদেরই একজন ভোজ। সান্টা-বান্টার যুক্তিতে ভাবলাম - সবাই যদি Visa পায়, তাহলে Mastercard পাবে কে? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগল, রান্নাটা দেখাল কে? জানতে পারলাম NABCর রান্নার হাল ধরার জন্য অন্য স্টেট থেকে উড়ে এসেছেন এক প্রসিদ্ধা রন্ধন বিশারদ। রান্নাঘরের উষ্ণতা তখনও তার পিছু ছাড়েনি। তাই সীমিত হয়েছে তার বেশবাস। তার রান্নার প্রশংসায় যাদের ওষ্ঠ প্রলম্বিত হয়েছে, তাদের কেউ ভাবছে "Trialটা না দিলে মন্দ হত না", আবার কেউ ভাবছে "আমার বউর চেয়ে তো ভালো রেধেছেন"।
সব ভাল যার শেষ ভাল। এর থেকে কি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে যার শেষ ভাল নয়, তার সব ভাল নয়। ঝোপ বুঝে কোপটা মারা হল। করা হল volunteer হওয়ার অনুরোধ। ব্যাকগ্রাউন্ডে নিঃশব্দে ধ্বনিত হচ্ছে "খাওয়ার আমন্ত্রণ মাঙ্গনা নয়"। মাথায় ঘুরছে চক্রব্যূহ, মাথায় ঘুরছে হাজারদুয়ারি। তখন ভরা পেটে বুদ্ধিনাশ। পালানোর কোনো রাস্তাই দেখা যাচ্ছে না। ভালোমানুষির মুখোসের তলায় গদের আঠা হয়ে উঠছে ক্যাট ফিসের ঝোল। ... অতএব ফাঁদে পা !
এবারের দায় বহন করেছিল প্রবাসী। Bay areaর একটি প্রাচীন বাঙালী সংগঠন। আমেরিকাতে ২৫ বছরেই ইতিহাস তৈরী হয়। সেক্ষেত্রে প্রবাসীকেও হয়ত ঐতিহাসিক বলা যেতে পারে বলে আমার ধারণা। এদের কোনো কোনো মহারথী চাকরী ছেড়েও NABCর কাজে প্রাণপাত করেছেন। বাঙালীর জন্য রবীন্দ্রনাথের নাইট প্রত্যাখ্যান আর এদের চাকরী ত্যাগের তুলনামূলক বিশ্লেষণ যে কোনোদিন কোনো চায়ের টেবিলের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
একদিন জনৈক এক পরিচিতা জানালেন NABCর food trial হচ্ছে। Internetএ ভোজ ক্যাটারারের নাম দেখে রসনার হুজুগে হাজির হলাম সেই ঐতিহাসিক trialএ। খাওয়ার ঠিকাদার এক South Indian রেস্টুরেন্ট। Cookbookএ বড় বড় করে লিখে নিয়েছেন যে রান্নাতে নারকেলের বদলে পোস্ত দিলেই তা বাঙালী রান্না বলে গণ্য হবে। তাকে জানানো হয়েছে যে মাছের ঝোল বাঙালীর চাইই। অতএব একটি পাত্রে দেখা দিয়েছে cat fishএর কালিয়া। আলু পোস্ত রান্নাতে কোনো কারিগরী সমস্যা দেখা দেওয়াতে তারা রেধেছেন বিন পোস্ত। মনে প্রশ্ন জাগল - এটা তরকারী, নাকি কিছু একটা contemporary? হাঁস যেমন জল বাদ দিয়ে দুধ খায়, তেমনই যারা আগে এসেছেন তারা আলু বাদ দিয়ে কষা মাংস খেয়ে ফেলেছেন। এখন অবশ্য আত্মগ্লানিতে ভুগে বাকি আলুর দিকে না তাকিয়ে তারা মিষ্টি খাওয়াতেই ব্যস্ত।
১০ ডলার দিয়ে পেলাম একটি প্লেট। অবশিষ্ট যা ছিল তা দিয়েই মেটালাম রসনার সেই অপরিণামদর্শী হুজুগ। জানতে পারলাম ভোজ ক্যাটারার আসছে না। পেলাম হোমওয়ার্ক না করার ফল। প্রতিবারের ন্যায় এবারেও যারা ভিসা পায়নি তাদেরই একজন ভোজ। সান্টা-বান্টার যুক্তিতে ভাবলাম - সবাই যদি Visa পায়, তাহলে Mastercard পাবে কে? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগল, রান্নাটা দেখাল কে? জানতে পারলাম NABCর রান্নার হাল ধরার জন্য অন্য স্টেট থেকে উড়ে এসেছেন এক প্রসিদ্ধা রন্ধন বিশারদ। রান্নাঘরের উষ্ণতা তখনও তার পিছু ছাড়েনি। তাই সীমিত হয়েছে তার বেশবাস। তার রান্নার প্রশংসায় যাদের ওষ্ঠ প্রলম্বিত হয়েছে, তাদের কেউ ভাবছে "Trialটা না দিলে মন্দ হত না", আবার কেউ ভাবছে "আমার বউর চেয়ে তো ভালো রেধেছেন"।
সব ভাল যার শেষ ভাল। এর থেকে কি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে যার শেষ ভাল নয়, তার সব ভাল নয়। ঝোপ বুঝে কোপটা মারা হল। করা হল volunteer হওয়ার অনুরোধ। ব্যাকগ্রাউন্ডে নিঃশব্দে ধ্বনিত হচ্ছে "খাওয়ার আমন্ত্রণ মাঙ্গনা নয়"। মাথায় ঘুরছে চক্রব্যূহ, মাথায় ঘুরছে হাজারদুয়ারি। তখন ভরা পেটে বুদ্ধিনাশ। পালানোর কোনো রাস্তাই দেখা যাচ্ছে না। ভালোমানুষির মুখোসের তলায় গদের আঠা হয়ে উঠছে ক্যাট ফিসের ঝোল। ... অতএব ফাঁদে পা !
Subscribe to:
Posts (Atom)